বুধবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৭

“সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিসের সনাক্তকরণের উপায় সম্বন্ধে একটু ভিন্ন চিন্তাধারা” ডাঃ দূর্গাপদ তরফদার

হোমিও সমীক্ষা, হোমিওপ্যাথিক ত্রৈমাসিক
পঞ্চদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, ১০/০৪/১৯৯৪
“সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিসের সনাক্তকরণের উপায় সম্বন্ধে একটু ভিন্ন চিন্তাধারা”
ডাঃ দূর্গাপদ তরফদার
আমরা জানি রোগ প্রধানত দুই প্রকারের—তরুণ রোগ এবং চির রোগ। আবার তরুণ রোগ তিন প্রকারের, যথা ব্যাক্তিতান্ত্রিক, বিক্ষিপ্ত ও সঙ্ক্রামক এবং অনুরুপ ভাবে বলা যায় যে, চির রোগও তিন প্রকারের যথা ভেষজ, মিথ্যা ও প্রকৃত। আবার এই প্রকৃত চির রোগগুলি কারণতত্ব অনুযায়ী তিনভাগে বিভক্ত। সোরা, সিফিলিস ও সাইকোসিস। তাছাড়া আরও একটু যোগ করে বলা যায় যৌগিক—দুটি বা তিনটি চির রোগের কারণে উদ্ভুত রোগ।
তরুণ পীড়ার রোগ হঠাৎ আসে; বহু, প্রবল লক্ষণেতে হয় এর বিকাশ; বিশিষ্ট ধরনের কারণ থাকে এদের পশ্চাতে; একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে এদের ভোগকালের; বিনা চিকিৎসায় রাখলে হয় সারে নয় মরে।
চির রোগ আসে অতি ধীরে, প্রায় রোগীর অজান্তে, লক্ষণের অপ্রাবলতা সঙ্খ্যাল্পতা আনে মনে একটা অগ্রাহ্য ভাব; কারণটির অনুসন্ধান করতে হয় রোগীর উপস্থিত, বিগত ও বংশগত ইতিহাসের মধ্য দিয়ে; কোন নির্দিষ্ট সময় রোগভোগের নেই। বলা যায় সারাজীবনই এবং বিনাচিকিৎসায় থাকলে এদের মৃত্যুর সাথে ঘটে বিলুপ্তি।
আবার তরুণ ও চির রোগের প্রতিটির একেবারে গোড়ার কারণ খুঁজলে দেখা যাবে এদের পশ্চাতে আছে একটি চিররোগবীজ যার নাম “সোরা”। তরুণ রোগ যদিও উত্তেজক কারণের জন্য ঘটে। তবু তার পশ্চাতে এই সোরাবীজের হাতছানি না থাকলে তরুণ রোগও হতে পারেনা। আবার অনেক সময় এই সোরাবীজ তরুণ রোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যৌগিক ক্রিয়ারও প্রকাশ দেখা দেয়। চিররোগের ক্ষেত্রে এই সোরাবীজের ভিত্তির ওপর রোপিত হয়—সিফিলিস ও সাইকোসিস বীজ। এতেও অনেক সময় সোরা-সিফিলিস, সোরা-সাইকসিস বা সোরা-সিফিলিস-সাইকসিস মিশ্রিত হয়ে যৌগিক আকার ধারণ করে।
তাই রোগী চিকিৎসাকালে এমনকি তরুণ রোগ চিকিৎসাকালেও মাঝে মাঝে প্রয়োজন অ্যান্টিমায়াজমেটিক বিশেষতঃ সোরানাশক ওষুধের, আর প্রকৃত চিররোগের ক্ষেত্রেও অ্যান্টিমায়াজমেটিক ওষুধের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তাই শুধু নয়, অনেক সময় ইন্টারকারেন্ট হিসাবে প্রয়োজন হয় রাজা অ্যান্টিমায়াজমেটিক ওষুধের যেখানে মায়াজম ঘটিত ব্যাধীটি দৃঢ়মূল থাকে।
আমার বক্তব্য এই মায়াজমেটিক ওষুধগুলো সম্বন্ধেই। আমাদের এমন কোন মেটেরিয়া মেডিকা কি আছে যেখানে ওষুধগুলোকে ঠিক মায়াজম নির্ভর ভাবে লক্ষণগুলো লেখা হয়েছে? সোরা, সিফিলিস, সাইকোসিসের’র লক্ষণগুলো আমরা যদি একটু খুঁটিয়ে পাঠ করি এবং সেই সঙ্গে মেটেরিয়া মেডিকার লক্ষ্মণগুলোর সঙ্গে মেলাই তবে দেখি “প্রতিটি ওষুধের মধ্যে দুচারটি বা বেশ কয়েকটি অথবা অধিক পরিমাণে প্রতিটি মায়াজমের লক্ষ্মণ নিহিত আছে”। মেটেরিয়া মেডিকার লক্ষ্মণগুলোর ... প্রতিটির উপর নজর না দিয়ে লক্ষণের আধিক্যে মায়াজমের প্রভাব অনুযায়ীই তাদের অ্যান্টিসোরিক, অ্যান্টিসিফিলিটি অ্যান্টিসাইকোটিক বা অ্যান্টিটিউবারকুলার নামকরণ করা হয়েছে।
কাজেই আমাদের অনুশাসনটি কি আরও গভীর ও ব্যাপক হয়না যদি আমরা এমন একটা মেটেরিয়া মেডিকা পাই যার প্রতিটি লক্ষণের পাশে লেখা থাকে এটি এই মায়াজমের লক্ষ্মণ! ওটা ওই মায়াজমের লক্ষ্মণ! সেটি সেই মায়াজমের লক্ষ্মণ! আমরা রোগীর লক্ষন সমষ্টির সহিত মেটেরিয়া মেডিকায় বর্ণিত ওষুধের লক্ষ্মণ সমষ্টির ওপর নির্ভর করে ওষুধ দিচ্ছি, কিন্তু সেই মায়াজমের কটি লক্ষ্মণ উক্ত ওষুধের লক্ষণের সঙ্গে মিলল এবং কটি অন্য মায়াজমের লক্ষ্মণ ঐ একই ওষুধে মিলল এটা ঠিকমত যাচাই করতে পারলে ওষুধের ক্রিয়া মনে হয় আরও সুষ্ঠ ও দ্রুততর হয়ে উঠবে।
এ বিষয়ে আমি সুধী ও জ্ঞানবৃদ্ধ চিকিৎসকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যাতে ভাবীকালের ছাত্রদের জন্য নতুন ধরণের মেটেরিয়া মেডিকা তৈরী করা হয় কারণ লক্ষ্মণগুলোর প্রতিটির মায়াজমেটিক ধারা বর্ণনা দ্বারা উক্ত ওষুধটির বর্ণনা আরও সমৃদ্ধ, সম্পুর্ণ ও যথোপযুক্ত হবে।
আমার স্বল্প জ্ঞান, পড়াশুনা, শিক্ষকতা ও প্রায় ৪৫ বৎসরের চিকিৎসা ব্যবসায় লিপ্ত থাকায় —অভিজ্ঞতা দিয়ে একটা উদাহরণ দিয়ে আমার উপরোক্ত চিন্তাধারা বিকাশের প্রচেষ্টা করছি।
প্রথমে মাত্র দুটি পুস্তক হাতে নিচ্ছি—একটি হল ডাঃ অ্যালেনের কী নোটস এবং অপরটি হল ডাঃ ফিলিস স্পাইটের কমপ্যারিজন অব ক্রনিক মায়াজম। অ্যালেনের কী নোটের প্রথম ওষুধ “অ্যাব্রোটেনাম” থেকে একটি একটি করে লক্ষ্মণ পাঠ করা যাক ও তাদের ফিলিস স্পাইট থেকে সংগ্রহ করে মায়াজম যোগ করা যাক। দেখা যাক কেমন হয়।
প্রথম লক্ষ্মণ হল—পর্যায়শীল কোষ্ঠবদ্ধতা ও উদরাময় বদহজমজনিত মল বা মলে ভুক্ত দ্রব্য। পর্যায়শীল লক্ষণের আতিশয্য দেখা যাবে টিউবারকুলার মায়াজমে এবং অজীর্ণ মল হবে সোরিক মায়াজম।
দ্বিতীয় লক্ষ্মণ হল—শিশুদের পুঁয়ে পাওয়া রোগ, বিশেষতঃ পায়ের দিকে; চর্ম থলথলে এবং খাঁজ খাঁজ হয়ে ঝোলে। পুঁয়ে পাওয়া শিশু হয় সাইকোটিক নচেৎ টিউবারকুলার। পায়ের দিকের শীর্ণতা সাইকোসিসের প্রতীক এবং খাঁজ খাঁজ হয়ে ঝোলা ইঙ্গিত দেয় টিউবারকুলার মায়াজমের।
তৃতীয় লক্ষ্মণ হল—দুর্বল মস্তক যা তুলে রাখতে পারেনা। এখানে দুর্বলতা এবং তার কারণস্বরূপ একে তুলে রাখার অক্ষমতা উভয়েই সোরার প্রতীক।
চতুর্থ লক্ষ্মণ হল—কেবল মাত্র নিম্নাঙ্গের শীর্ণতা। এটি সাইকোসিসের পরিচায়ক।
পঞ্চম লক্ষ্মণ হল—রাক্ষুসে ক্ষুধা; ভাল খায় অথচ শুকিয়ে যায়। রাক্ষুসে ক্ষুধা প্রধানতঃ সোরিক বলেই ধরা হয়ে থাকে। কিন্তু ভাল খায় অথচ শুকিয়ে যায় টিউবারকুলার মায়াজমের লক্ষ্মণ।
ষষ্ঠ লক্ষ্মণ হল—খিল ধরা বা কলিক যন্ত্রণার থেকে উদ্ভূত দেহের বিভিন্ন অংশে যন্ত্রনাদায়ক সঙ্কোচন ভাব। এদের একটি হচ্ছে কারণ খিল ধরা বা কলিক যন্ত্রণা অপরটি হল তারই প্রতিক্রিয়া । এতএব আসল লক্ষনটা হল যন্ত্রণাদায়ক সঙ্কোচন। এটি যদিও একটি নৈদানিক অবস্থা তবুও বলা যায় দেহের এক স্থানের রোগ যেন আর এক স্থানে প্রবাহিত—অনেকটা ইংরাজিতে মেটাস্টিসিসের মত, এতএব আটাকে আমরা সাইকোটিক মায়াজমের অন্তর্ভুক্ত করতে পারি।
সপ্তম লক্ষ্মণ হল—বাতরোগ, যাতে স্ফিতী উদরের পূর্বেই অত্যন্ত যন্ত্রণা জন্মায়, যে বাতরোগ হঠাত চাপা পড়া উদরাময় অথবা অন্য প্রকার স্রাবের হঠাৎ অবরোধে উৎপন্ন হয়, অর্শ বা আমাশয়ের সঙ্গে পর্যায়শীল হয়। বাতরোগটিকে আমরা সাধারনতঃ সাইকোটিক রোগের অন্তর্ভূক্ত করে থাকি, বিশেষতঃ তার ফোলা ও যন্ত্রণায়। উদরাময় চাপা পড়ে বাতরোগ অনেকটা মেটাস্টিসিসের মত অতএব সাইকোসিসের অন্তর্ভূক্ত, আবার অন্য কোন স্রাব রোধ হওয়ায় বাতরোগ—এটাকে ওই একই মেটাস্টিসিসের কারণে সাইকোটিক মায়াজমের মধ্যে ধরা হয়ে থাকে। অবশেষে পর্যায়শীল ক্রিয়াটা আমরা প্রথম লক্ষনেই জেনেছি ডাঃ ফিলিস স্পাইট এগুলোকে টিউবারকুলার মায়াজমের অন্তর্গত বলে জানিয়েছেন।
অষ্টম লক্ষ্মণ হচ্ছে—গাঁটগুলো ফুলা এবং শক্ত, খোঁচামারা যন্ত্রণা, কব্জি ও পায়ের গোড়ালী প্রদেশে স্ফীতভাব ও যন্ত্রণা। গাঁট বা সর্দির রোগ সাইকোসিসে গিয়ে পরে। কিন্তু খোঁচামারা যন্ত্রণা সোরিক, আবার কব্জি ও গোড়ালী প্রদেশে রোগ গিয়ে পড়ে সাইকোসিসে।
নবম লক্ষ্মণ হল—সর্বাঙ্গে খঞ্জ বা টাটানি ভাব। এ ধরণের ব্যথা সাইকোসিসেরই।
দশম লক্ষন—একপ্রকার চর্মরোগ বিশেষ যা সোরা মায়াজমের অন্তর্ভূক্ত।
একাদশ লক্ষ্মণ—খুব দুর্বলতা ও অবশতা এবং এক প্রকারের শিশুদের অনিয়মিত জ্বর। দুর্বলতা টিউবারকুলার মায়াজমের পরিচায়ক, আর অনিয়মিত জ্বর সাইকোসিসের অধীন।এই স্তরে আরও আছে দাঁড়াতে অসমর্থ—এটা দুর্বলতারই পরিচায়ক, কিন্তু দাঁড়ালে বৃদ্ধি সোরার পরিচায়ক।
দ্বাদশ লক্ষণ—শিশুটি বদ স্বভাবের, খ্যাঁকখেকে, বিরক্তিকর, অবমাননাকর, তীব্র, অমানবিক, নিষ্ঠুর কিছু করার প্রবণতা। বদ স্বভাব সাইকোসিসের অন্তর্গত হয়, খ্যাঁকখেকে মেজাজটাও সাইকোসিস অন্তর্ভুক্ত, বিরক্তিকরও সাইকোসিস। অবমাননাকর কিন্তু সিফিলিসের অন্তর্গত, এমন কি তীব্র, অমানবিক ও নিষ্ঠুরতা এদের প্রত্যেকটাই হচ্ছে সিফিলিসের পরিচায়ক।
ত্রয়োদশ লক্ষ্মণ—মুখাবয়ব ফ্যাকাশে, বৃদ্ধের মত খাঁজকাটা যা টিউবারকুলার মায়াজমের ইঙ্গিত দেয়।
এবার একটি অঙ্ক করে দেখা যাকঃ
সোরা মোট ৭টি লক্ষ্মণ
সিফিলিস মোট ৩টি লক্ষ্মণ
সাইকোসিস মোট ১৪টি লক্ষ্মণ
টিউবারকুলার মোট ৬টি লক্ষ্মণ
মোট ৩০ টি লক্ষ্মণ
এবার বলুনতো অ্যাব্রোটেনাম ওষুধটি কোন মায়াজমের অন্তর্গত হবে? ডাঃ কেন্ট ও ডাঃ বোগার তাদের রিপার্টোরির ১৪০৬ ও ৭৩৮ পৃষ্ঠায় সাইকোসিস ও সিফিলিসের যে ওষুধ তালিকা দিয়েছেন তাতে অ্যাব্রোটেনামের উল্লেখ নেই। তাহলে হয় এটি সোরাজাত অথবা টিউবারকুলারজাত হবে, কিন্তু সোরার লক্ষ্মণ মাত্র ৭টি আর টিউবারকুলারের মাত্র ৬টি লক্ষ্মণ উপস্থিত। তাহলে?
আবার এলেনস কি নোটে সব লক্ষ্মণ নেই। সব লক্ষ্মণ সংগ্রহ করে এইরূপ প্রতিটি ভেষজের মায়াজম ঘটিত লক্ষ্মণ নির্ধারনে ওষুধগুলোকে কি ধরণের মায়াজম ঘটিত তবেই প্রকাশ করা কি যথাযথ হবে না?

1 টি মন্তব্য:

  1. মায়াজম নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে লেখাটা পেলাম।খুবই ভাল লেগেছে আমার।অর্গানন পড়লে আমরা দেখতে পাই আদর্শ আরোগ্য কেবল মায়াজমেটিক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমেই সম্ভব যদি আল্লাহতালার হুকুম থাকে।
    তাই মায়াজম ভিত্তিক মেটেরিয়া মেডিকা খুবই প্রয়োজনীয়। এটা আমাদের নতুন প্রজন্মের চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের জন্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ও অধ্যায়ন আরো সহজতর করে দিবে বলে আমি মনে করি।

    উত্তরমুছুন

Arsenic Album Benefits and Side Effects!

http://www.ihomeopathic.com/2017/04/arsenic-album-benefits-and-side-effects.html#more Arsenic Album 30 is the most commonly used remed...