রবিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৭

হোমিওপ্যাথি শিক্ষায় অর্গাননের ভূমিকা

সবাই যেমন সাহিত্যিক হতে পারেনা, সবাই যেমন কবি হতে পারেনা বা বিজ্ঞানী হতে পারেনা বা দার্শনিক হতে পারেনা, সেই রকম সকলের পক্ষেই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হওয়াও সম্ভব নয়। প্রত্যেকটি বিষয়ে পরিপূর্ণতা লাভের পিছনে থাকে বহু অনুকূলতা, পারিপার্শ্বিকতা, প্রকৃতির সতঃপ্রবৃত্ত সহায়তা, আর থাকে উপরোক্ত এক একটি বিষয়ে পরিপূর্ণ হবার মত আধার বা ক্ষেত্র এবং একটি প্রবণতা সহ সহজাত প্রতিভা। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের ক্ষেত্রেও ঐ নিয়মের ব্যতিক্রম নেই। আবার এই ক্ষেত্র বা আধার সকলের সমান হয়না, সমান হয়না সকলের প্রবণতা ও প্রতিভা। সেই হেতু সকলেই সমান স্তরের হতে পারেন না, কিছু তারতম্য থাকেই। কার ভিতরে কোন বিষয়ের কতখানি প্রতিভা আছে তা সব সময় আগে থেকেই নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। আমার আলোচনা হোমিওপ্যাথি নিয়ে, হোমিওপ্যাথি শিক্ষায় অর্গাননের ভূমিকা নিয়ে, তাই আমার বক্তব্য হলো—হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞানকে জানবার, উপলব্ধি করবার আগ্রহ আকাঙ্ক্ষা যদি না থাকে, অনুরাগ যদি না থাকে, পিপাসা যদি না থাকে তাহলে তাঁর পক্ষে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিদ্যা আয়ত্ব করা কখনো সম্ভব হবেনা, সম্ভব হবেনা প্রকৃত হোমিওপ্যাথ হওয়া। এপথ তাঁর পথ নয়, তাঁর অন্যপথে পা বাড়ানই উচিৎ। শুধু উদরান্নের জন্য বা পয়সা উপার্জনের উদ্দেশ্য নিয়ে হোমিঅপ্যাথির নাম দিয়ে মিশ্রপ্যাথি করব— এই ধারণা যদি কারো থাকে তাহলে তিনি শুধু নিজেকেই প্রবঞ্চিত করবেন না—সরল বিশ্বাসে যত রোগী আসবে তাঁর কাছে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় নির্মল আরোগ্যের আশা নিয়ে, তাঁদেরকেও প্রবঞ্চিত করবেন এবং মহান হোমিওপ্যাথির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে অপরাধী বলে সাব্যস্ত হয়ে থাকবেন সমগ্র হোমিওপ্যাথিক সমাজের কাছে এমনকি সত্যের কাছেও। অর্গাননের ৫২ সূত্রে হ্যানিম্যান এই ধরণের সতর্কবানী রেখে গেছেন আমাদের জন্য।
কিন্তু যেমন নবীন শিক্ষার্থী হোমিওপ্যাথি শিক্ষার, হোমিওপ্যাথিকে উপলব্ধি করবার আকুল আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগিয়ে আসেন, তাঁদের অনেকই আজেবাজে হোমিও পুস্তক পড়ে অনেক সময় নষ্ট করেন, পথভ্রষ্ট হন, এমনকি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষানীতির দোষে হয় বিপথগামী হন, না হয় মূল্যবান সময়ের অনেক খানিই নষ্ট হয়ে যায়। সেই সব নব অনুরাগীদের সতর্ক করবার জন্যই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। অনেক রকমে শেখার ভেতরে ঠ’কে শেখার মূল্য অনেক বেশী। বয়স্কদের মধ্যে এই অভিজ্ঞতা অনেকই লাভ করেছেন প্রচুর। তরুণ শিক্ষার্থীগন যাতে আর বেশী না ঠকেন সেটাই আমার আকাঙ্ক্ষা।
প্রথমেই জানিয়ে রাখি কয়েকটি বিশিষ্ট গুনের অধিকারী হতে হবে অথবা হবার জন্য সচেষ্ট হতে হবে প্রত্যেক হোমিও শিক্ষার্থীকে—যেমন সত্যনিষ্ঠা, বিবেকী, পরিশ্রমশীল, ধৈর্য্যশীল, এবং সাধনায় সিদ্ধির জন্য দৃঢ়পণ।
অন্যান্য প্রচলিত চিকিৎসাবিদ্যা থেকে হোমিওপ্যাথি একেবারে আলাদা। অন্যান্য চিকিৎসানীতির সঙ্গে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নীতির কোন মিল ত নেইই বরং বিপরীত। সেই হেতু প্রচলিত অন্যান্য চিকিৎসাবিদ্যার ছাঁচে হোমিওপ্যাথিকে ঢেলে তৈরী করতে গেলে হয়ে যায় কাঁঠালের আমসত্ব বা সোনার পাথরবাটি অর্থাৎ অর্থহীন একটা অদ্ভুত বস্তু। এনাটমি, ফিজিওলজি প্রভৃতি পাঠ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিদ্যাতেও অবশ্য প্রয়োজন কিন্তু সেটা হওয়া চাই সদৃশ বিধানের পরিমণ্ডলে বা হোমিওপ্যাথিক আবহাওয়ায়। হোমিওপ্যাথি শিক্ষার একেবারে মূলভিত্তি হবে ডাঃ হ্যানিম্যানের অর্গানন অফ মেডিসিন। অর্গাননের প্রতিটি সূত্রকে অবলম্বন করে ধাপে ধাপে এগিয় নিয়ে যেতে হবে এনাটমি, ফিজিওলজি, প্যাথলজি, ফার্মাকোলজি, গায়নিকলজি ইত্যাদির পাঠসমূহকে। প্রথম থেকে অর্গাননকে বাদ দিয়ে ঐ সমস্ত পুস্তক পাঠে বিপরীত ফল হওয়াও বিচিত্র নয়। হোমিওপ্যাথি শিক্ষার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, যা কিছু জ্ঞাতব্য তার সবটুকুই আছে ডাঃ হ্যানিম্যানের অর্গানন খানিতে। বাংলায় যেমন একটি প্রবাদ বাক্য আছে “যা নাই ভারতে(মহাভারতে) তা নাই ভারতে( ভারতবর্ষে)”, তেমনি আমরাও জোর দিয়ে বলতে পারি—যা নেই অর্গাননে, তা প্রয়োজন নেই হোমিওপ্যাথিতে। অর্গাননকে তো আগে গুরুত্বই দেওয়া হতোনা—অবহেলিতই থেকেছে বেশী একথা আমাদের পূজনীয় ডাঃ দীর্ঘাঙ্গী আক্ষেপ করে বহুবার বলেছন। বর্তমানে কয়েকটি হোমিওপ্যাথিক পত্রিকায় কয়েকজন বিশিষ্ট চিকিৎসক অর্গাননের অপরিহার্য্য উপযোগিতা ও গুরুত্ব প্রচার করছেন। এঁদের মধ্যে ডাঃ ত্রিগুননাথ বন্দোপাধ্যায়, ডাঃ বি কে বসু(হাঃ সঃ), ডাঃ জে এন কাঞ্জিলাল, ডাঃ এম ভট্টাচার্য্য প্রভৃতি চিকিৎসকদের অবদান প্রচুর এবং বহু হোমিওপ্যাথের অর্গাননের উপর আগ্রহ আনার হেতু স্বরূপ। অর্গানন বিষয়ে বলার জন্য প্রবল আন্তরিকতা নিয়ে যিনি বার বার আমাদের কাছে এগিয়ে আসেন, তিনি হ’লেন আমাদের শ্রদ্ধেয় সহযোগী ডাঃ বিষ্ণুবিহারী চ্যাট্টার্জী। তিনি নিজে যে সত্যের সন্ধান পেয়েছেন তা আমাদের মত সাধারণ চিকিৎসকদের বিতরণ করার ব্যাকুলতার জন্য আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ(কারো ব্যক্তিগত প্রশংসার উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এইসব নাম উল্লেখ করছিনা,—আমাদের আদর্শ হিসাবে দাঁড় করাবার জন্যই ঐসব অর্গাননের শিক্ষক এবং যোদ্ধাগণের নাম উল্লেখিত হল।) ডাঃ চ্যাটার্জীর অর্গাননের ওপর গভীর অনুরাগ তাঁর জ্ঞানকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে—যা আমাদের মুগ্ধ করে, যা প্রতিটি হোমিওপ্যাথের পক্ষেই শিক্ষার বিষয় এবং আদর্শ স্থানীয়।
আমি আবার একথা জোর দিয়েই বলতে চাই যে হোমিওপ্যাথি শিক্ষাই যদি হয় আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যবস্তু তাহলে অর্গানন খানিকে সদাসঙ্গী করে রাখতে হবে, বার বার পড়তে হবে, হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করতে হবে, প্রয়োজনে উপযুক্ত গুরুর সাহায্য নিতে হবে। অন্যথায় প্রকৃত হোমিওপ্যাথ হওয়া যাওয়া যাবেনা। ডাঃ কেন্ট, ডাঃ স্টুয়ার্ট ক্লোজ এবং আরও কয়েকজন বিদেশী মনীষী যে হোমিওপ্যাথিক ফিলসফি প্রভৃতি এই শ্রেণীর বই লিখেছেন তা শুধু অর্গাননের ভাবধারাকে সুপরিস্ফূট করার জন্য। বাংলাতেও যে সব হোমিওদর্শন রচিত হয়েছে তাও ঐ একই উদ্দেশ্যে।
অর্গাননের ভাবরূপটি যদি সংক্ষেপে প্রকাশের চেষ্টা করি তাহলে এখানে সেটা অপ্রাসঙ্গিক হবেনা বলেই মনে করি। ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান তাঁর অর্গানন খানিকে মোট ২৯১টি সূত্রে গ্রথিত করেছেন। এই ২৯১টি সূত্রের অর্গাননকে মোটামুটি ৫ ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
(১) প্রথম সূত্র থেকে ৭০ সূত্র পর্যন্ত হ্যানিম্যান চিকিৎসকের উদ্দেশ্য, জীবনীশক্তি ও তার ক্রিয়া, রোগশক্তি ও জীবনীশক্তির ক্রিয়ার সমন্বয়, ভেষজশক্তি ও জীবনীশক্তির ক্রিয়ার সমন্বয়, লক্ষ্মণ সমষ্টি, অসদৃশ বিধান ও সদৃশ বিধান দ্বারা চিকিৎসার তাৎপর্য, ওষুধের ও জীবনীশক্তির মুখ্য ও গৌনক্রিয়া প্রভৃতি হোমিওপ্যাথিক আরোগ্যকলা ও হোমিওদর্শন সম্বন্ধে এমন তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন যা আমাদের মনকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার প্রতি আস্থা ও দৃঢ়তা সহকারে গঠন করে।
(২) কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ পদ্ধতি জানা না হলে সে জ্ঞান অবাস্তব হয়ে যায়, তার কোন মূল্য থাকেনা বলেই তিনি ৭১ সূত্র থেকেই এই আলোচনা শুরু করেছেন। ৭১ সূত্র থেকে ১০৪ সূত্র পর্যন্ত হ্যানিম্যান রোগ পরিচয়, অ্যাকুট ও ক্রনিক রোগ, অসদৃশ বিধানের চিকিৎসায় রোগী হয় দুশ্চিকিৎসা, মায়াজমস সমূহের পরিচয় ও তাদের রোগ সৃষ্টি ক্ষমতা এবং ভূমিকা, মহামারী রোগের অনুসন্ধান ও চিকিৎসা, লক্ষ্মণ সমষ্টি কিভাবে সংগ্রহ করতে হয়(Case taking) প্রভৃতি বিষয় আমাদের জানিয়েছেন।
(৩) রোগ বা রোগী সম্বন্ধে জানবার পর কিভাবে এবং কোন উপায় অবলম্বনে রোগ শত্রুকে নির্মূল করা যায় তা অবশ্যই জানতে হবে। আর সেটা জানার প্রধান উপায় হলো প্রতিটি ভেষজের আরোগ্যশক্তিকে জানা। তা জানা যাবে কেমন করে? হ্যানিম্যান বলেছেন মানুষের সুস্থ দেহে ওষুধের পরীক্ষা দ্বারাই(Drug proving) তার অন্তর্নিহিত আরোগ্যদায়িনী শক্তির পরিচয় পাওয়া যাবে—অন্য কোন উপায়ে তা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন অর্গাননের ১০৫ সূত্র থেকে ১৩৫ সূত্রে। এই Drug proving প্রকৃতপক্ষে হ্যানিম্যানের সম্পুর্ণ নিজস্ব আবিষ্কার এবং তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ দান। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অসাধারন।
(৪) ওষুধ এবং ওষুধের রোগ আরোগ্যশক্তি জানবার পর জানবার বিষয় হলো ভেষজশক্তি সর্বশ্রেষ্ঠ প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে। তাই তিনি ১৪৬ সূত্র থেকে ২৮৪ পর্যন্ত এই বিরাট অধ্যায়ে প্রয়োগ বিজ্ঞেনের যা কিছু জ্ঞাতব্য, যাবতীয় খুঁটি নাটি প্রয়োজনে আসতে পারে এবং আরোগ্যের কোথায় বাধা আসতে পারে তা এমনই পরিপূর্ণভাবে আমাদের জানিয়েছেন যে কোথাও এতটুকু ফাঁক খুঁজে পাওয়া যাবে না।
(৫) সবশেষে ২৮৬ সূত্র থেকে ২৯১ সূত্র পর্যন্ত তিনি তড়িৎচুম্বক, শক্তিশালী চুম্বক শলাকা, মেসমেরিজম ও জল চিকিৎসা প্রভৃতি আমাদের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার আনুষঙ্গিক ও সহায়ক হিসাবে কতখানি কার্য্যকরি তাও জানিয়েছেন। এই হলো সমগ্র অর্গাননখানির সংক্ষিপ্ত রেখাচিত্র। মহাত্মা হ্যানিম্যান আরও সংক্ষিপ্ত আকারে গোটা অর্গাননের ভাবমূর্তিকে মাত্র একটি সূত্রে সন্নিবদ্ধ করে রেখেছেন বিস্ময়করভাবে এই অর্গাননের ৩য় সূত্রে। যদিও ৩য় সূত্র সমস্ত চিকিৎসকের বহু পঠিত, তাহলেও সত্য বস্তুর যতই আলোচনা হয়, ততই উপকার, অন্ততঃ আমাদের মত সাধারণ চিকিতসকগনের। হ্যানিম্যান বলেছেনঃ—“যদি চিকিৎসকের স্পষ্ট বোধ থাকে পীড়ায় অর্থাৎ ‘প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে কি সারাতে’ হবে(ব্যাধি সম্বন্ধে জ্ঞান)” দেখুন কত গভীর অতলস্পর্শী অনুসন্ধানে আমাদের নিমগ্ন করে দিলেন, রোগ বা রোগী সারাবার স্পষ্ট বোধ না বলে বলছেন প্রত্যেকটি রোগীর ক্ষেত্রে কি সারাতে হবে(in every individual case of disease) তাহলে সেখানে এমন একটা বস্তুর কথা বলেছেন আরোগ্য করার জন্য যা প্রত্যেকটি রোগীর ক্ষেত্রে উপস্থিত, যা সুস্থদেহে এসে এমন অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি করেছে বলে তাকে রোগী বলা হচ্ছে, কি সে বস্তু? কি আরোগ্য করবার জন্য আমাদের রোগের মধ্যে, রোগীর মধ্যে তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান করতে হবে? তার মীমাংসা করেছেন পরবর্তী সুত্রগুলিতে। বলেছেন এই হলো (Knowledge of disease, indication) ব্যাধি সম্বন্ধে জ্ঞান লাভের একমাত্র পন্থা, যা প্যাথলজির জ্ঞানের দ্বারা জানা কখনো সম্ভব হবেনা। একমাত্র অর্গানন ছাড়া প্রকৃত রোগ বিজ্ঞান সম্বন্ধে জ্ঞানলাভের আর কোন গ্রন্থ নাই, পরে যা লেখা হয়েছে তা অর্গাননকে বোঝাবার জন্য। এরপর বলেছেন “যদি তিনি পরিষ্কার উপলব্ধি করেন ওষুধের মধ্যে কি আরোগ্যশক্তি নিহিত আছে, যেমন বলছি প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট ওষুধের মধ্যে(ভেষজের শক্তি সম্বন্ধে জ্ঞান)” এই একটি লাইনেই আমাদের জানতে বলছেন drug proving থেকে আরম্ভ করে প্রত্যকটি ওষুধের কৃত্রিম রোগলক্ষন সৃষ্টির সাথে পরিচয় অর্থাৎ এক কথায় সমগ্র মেটেরিয়া মেডিকায় উপযুক্ত জ্ঞান অর্জনের কথাই বলেছেন। কথা একটি কিন্তু এরই সাধনায় সারা জীবনই কেটে যাবে আমাদের। এর পর বলছেন “যদি তিনি জ্ঞাত থাকেন রোগীর মধ্যে যা রোগ বলে নিঃসন্দেহে জানা গেছে তার উপর স্পষ্ট ধারণাযুক্ত নীতি অনুযায়ী কেমন করে ওষুধের আরোগ্যশক্তিকে (What is curative in medicines) প্রয়োগ করতে হয়—যার ফলে আরোগ্য ক্রিয়াটি অবশ্যই অনুসৃত হবে—এবং ওষুধটির কার্য প্রণালী অনুযায়ী রোগীর ওপর প্রয়োগের যোগ্যতা সম্বন্ধে সেটি যথেষ্ট সুনির্বাচিত কিনা (Choice of the remedy, the medicine indicated)” (সদৃশনীতি অনুসারে ওষুধ নির্বাচন) প্রথমেই তিনি রোগ বিজ্ঞান সম্বন্ধে জ্ঞানের কথা বলেছেন যেমন রোগীলক্ষ্মণ সংগ্রহে পারদর্শিতা এমন হওয়া চাই যাতে সেই সংগৃহীত লক্ষন-সমষ্টির মধ্যে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য পরিস্ফুট হয়—তার পরে বলেছেন ভেষজ বিজ্ঞান বিষয়ে উপলব্ধির কথা অর্থাৎ প্রত্যেকটি ওষুধের লক্ষ্মণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে গঠন হয় এক একটি ওষুধের এক একটি স্বতন্ত্র ছবি, প্রত্যেক ওষুধের সম্বন্ধে পরিষ্কার জ্ঞান থাকা চাই তবেই সম্ভব হবে রোগীর বিশিষ্ট ছবির সদৃশ একটি ওষুধের ছবির সন্ধান পাওয়া অর্থাৎ রোগী চিত্রের সদৃশ ওষুধটি নির্বাচনের ক্ষমতা। এই কথাই বলেছেন (Choice of the remedy, the medicine indicated) বাক্যটির দ্বারা। অবশ্যই এই বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা আমরা অর্গাননের পরবর্তী সূত্রগুলির মধ্যেই পাব আরও বলেছেন তিনি “এছাড়াও ওষুধ প্রস্তুত করবার প্রকৃত পদ্ধতি, কি পরিমাণে প্রয়োজন(উপযুক্ত মাত্রাজ্ঞান) এবং পুনঃ প্রয়োগ করবার উপযুক্ত সময়, এবং পরিশেষে প্রত্যেকটি আরোগ্যের ক্ষেত্রে কি বাধা ও তাকে কি উপায়ে দূরীভূত করা যায় যাতে করে আরোগ্য কার্যটি স্থায়ী হতে পারে—চিকিৎসকের এই সকল যদি জানা থাকে তাহলে সুবিজ্ঞতা ও বিচারবুদ্ধিসম্মত ভাবে কি প্রকারে চিকিৎসা করা যায়, তখন তাঁর বোধগম্য হবে এবং তখনই তিনি হবেন আরোগ্য নৈপূণ্যে প্রকৃত চিকিৎসক।
একটি ক্ষুদ্র বীজে যেমন থাকে একটি বিরাট বটবৃক্ষ, সেই রকম এই সূত্রটিতে নিহিত আছে সমগ্র হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশ্বরূপ। ধনঞ্জয়ের সাধনাতেই যেমন বিশ্বরূপ দর্শন সম্ভব হয়েছল সেইরূপ যাঁরা হোমিওপ্যাথির ধনঞ্জয়, হোমিওপ্যাথির সব্যসাচী, তাঁরাই পারেন দর্শন করতে হোমিওপ্যাথির বিশ্বরূপ অর্থাৎ সামগ্রিকতা। সুতরাং চিকিৎসাশাস্ত্রের অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞান লাভের জন্য আমরা সমস্ত চিকিৎসাবিদ্যা বিষয়ক পুস্তক থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারি তাতে কোন বাধা নেই কিন্তু হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসককে সম্পূর্ণরূপে হতে হবে অর্গাননের নীতি নির্ভর। ডাঃ কেন্টের মত বিশ্ববরেণ্য চিকিৎসকও বলেছেন—অর্গানন, মেটেরিয়া মেডিকা, রেপার্টরী হবে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের সদাসঙ্গী। শুধু কেন্টই তাঁর হোমিওপ্যাথিক ফিলসফি বইতে ডাঃ হ্যানিম্যানের অর্গাননের অখণ্ডনীয় নীতির জন্য বিস্ময় প্রকাশ করেন নি বিশ্বের সমস্ত শ্রেষ্ঠ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগন নানা ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা কোথাও এতটুকু সংশোধনযোগ্য ত্রুটি না পেয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে মাথা নত করে অর্গানন প্রদর্শিত নীতিই হোমিওপ্যাথের একমাত্র অবলম্বন বলে ঘোষনা করে গেছেন। বর্তমান কালেও যাঁরা যুগশ্রেষ্ঠ হোমিওপ্যাথরূপে আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র হয়েছেন, তাঁরাও মহাত্মা হ্যানিম্যানের নীতিকে অবলম্বন করেই এবং অর্গাননের প্রতিভাতেই প্রতিভাত হয়েছেন।
লেখক: ডাঃ মহিমারঞ্জন মুখোপাধ্যায়

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Arsenic Album Benefits and Side Effects!

http://www.ihomeopathic.com/2017/04/arsenic-album-benefits-and-side-effects.html#more Arsenic Album 30 is the most commonly used remed...